মারমা তরুণের মনের আলো

606
Advertisement
:শফিক কলিম : দেশের শীর্ষ ফুটবলে মাত্র পা পড়েছে, অপেক্ষা অভিষেকের; বয়স মাত্র ২১, খেলার মাঠে নামতে না পারলেও অন্য ভুবনে বেশ সাড়া ফেলেছেন তরুণ অসাই মং মারমা! দুর্গম পাহাড়ে একদল অনাথ শিশুর এগিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তিনি।

বাড়ি থেকে চাঁদের গাড়িতে আধা ঘণ্টার পাহাড়ি পথ, এরপর প্রত্যন্ত ক্যকরোপপাড়া ক্যাং উঃ ওয়ারিন্দা সামাজিক আবাসন (অনাথ আশ্রম)। ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ অনাথ শিশু ব্যক্তিগতভাবে লালন-পালন করছেন ধর্মগুরু ভাংতে। ছোট্ট শিশুরা সেখানে যথেষ্ট কষ্টের মধ্যে জীবন-যাপন করছে; নিজেরা রান্না করে খায়, পড়াশোনা করে। শিশুদের এমন কষ্টের জীবন দেখে মনের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে অসাইয়ের। বললেন, ‘যখন এটা জানতে পারি এরপর থেকে নিজের প্রয়োজনের সব কিছু থেকে বাঁচিয়ে রাখতে শুরু করি। ধর্মগুরু যে কোনো সহযোগিতা চাইলে, করতে থাকি।’ আশ্রমে খাবার দিতে গেলে অনাথ শিশুরা তার কাছে বল চেয়ে বসে; গাঁটের টাকায় এটা-সেটার সঙ্গে জার্সিও দেওয়া শুরু করেন। স্বপ্ন দেখেন যতটা সম্ভব পিছিয়ে পড়া নিজ সম্প্রদায়কে টেনে তোলা; তা ফুটবল দিয়ে। সম্প্রতি ২৫ হাজার টাকার ফুটবল, জার্সিসহ প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম কিনে দিয়েছেন তিনি।
বান্দরানবান শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় বাড়ি অসাইয়ের। দুই ভাইয়ের ছোটটি দিপু মারমা। নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম পাহাড়ি আদিবাসীদের পেশাদার ফুটবল সম্পর্কে ধারণা নেই। বোঝে, পড়াশোনা করে চাকরি করা। ফুটবল আর্থিক নিশ্চয়তা এনে দিতে পারেনা, এ নিয়ে গ্রামে পথে-ঘাটে নানা কথা শুনতে হয়েছে অসাইকে; ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে বাবা-মাও চাননি ছেলে ফুটবল খেলুক। তবে বছর খানেক ধরে বোধোদয় হচ্ছে; এবং তার কল্যাণেই! কীভাবে’র ব্যাখ্যাও দিলেন সাইফের তরুণ ফরোয়ার্ড, ‘গেল বছর বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৮ সাফ খেলে আসা ফলাও হয় শহরে। তখন সবাই বোঝে ফুটবলে ভালো কিছু সম্ভব।’ থিম্পুতে মালদ্বীপের বিপক্ষে বদলি খেলেছেন; এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টে শ্রীলঙ্কা ম্যাচে খেলেছেন শেষ দিকে।
২০১৫-১৬ মৌসুমে চট্টগ্রাম মোহামেডানের হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ খেলেন অসাই। দ্বিতীয় স্তরে খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে জাতীয় ‘বি’ দলে মতিন মিয়া, সাঈদের সঙ্গে অসাইকে ডাকেন ট্রেনার জন হুইটাল, গোলরক্ষক কোচ রায়ান। অস্ট্রেলিয়ান কোচ অ্যান্ড্র অর্ডের অধীনে অনুশীলনের সুযোগও পান। এ বছর তাকে দলে নিয়েছে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব; ব্রিটিশ কোচ স্টুয়ার্ট হলের অধীনে পরিণত হয়ে উঠছেন; তৈরি হচ্ছেন আগামীর জন্য।
অসাইয়ের আগে রাঙ্গামাটির বিপ্লব মারমা খেলেছেন ঢাকায়। বান্দরবান থেকে আর কোনো পুরুষ ঢাকার ফুটবলে খেলেছে কিনা, তরুণের অজানা থাকলেও জানেন কয়েকজন নারী প্রতিনিধিত্ব করছেন জাতীয় দলে! তৃষ্ণা চাকমার বাহুতে ছিল জাতীয় দলের আর্মব্যান্ড। অংসাইয়ের স্বপ্ন তারপর দেশের শীর্ষ ফুটবল মাতাবে বান্দরবানের ভবিষ্যত প্রজন্ম; তাই নিজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই চেষ্টা শুরু করেছেন। নাইক্ষ্যংছড়ি সদরের স্থানীয় বেসরকারি স্কুলের মাঠে রোজ বিকালে অনুশীলন হয়। সেখানে খেলতে খেলতে অসাইয়ের স্বপ্ন পূরণে তৈরি হচ্ছে প্রায় অর্ধশত কিশোর। নাইক্ষ্যংছড়ির গহীনে এতটা অভাব-অনটনে বড় হচ্ছে আঁখিও, অনুথোয়াইরাÑ যে টাকার অভাবে ঢাকা পাঠাতে চাননি তাদের বাবা-মা। তাছাড়া বয়সও কম, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তারপরও অসাইয়ের অনুরোধে স্থানীয়রা চাঁদা তুলে তাদের ঢাকা পাঠান।

লেখক ঃ সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ।