মোস্তফা ভাই, এ অপরাধবোধ শোধরাব কিভাবে?

646
Advertisement

॥ দীপ্ত হান্নান ॥ সময় করে আসিস..কিছু গুরুত্বপুর্ণ কথা আছে….আমার আর যাওয়া হল না। প্রিয় মোস্তফা ভাই, আমার এই অপরাধবোধ শোধরাব কিভাবে? আপনিতো চলেই গেলেন, একেবারে। এই পৃথিবীর সব মায়া ত্যাগ করে। জনব্যস্ততায় নিজেকে বুঁদ করে রাখা, একা কিভাবে চলে যেতে পারলেন? মাথায় আসে না। নিজেকে বুঝাতেও পারছি না, আপনি নেই। জানি, ১৫ ডিসেম্বরের দুপুরে আপনার জানাযা নামাযের পর আপনি আর থাকবেন না। তবুও, অবুঝ মনটাকে বুঝাতে পারি না যে, আপনি নেই। আমার কাছে আপনি না থাকা মানে, অনেক কিছুই নেই। যারা আমার-আপনার সম্পর্কটাকে খুব গভীরভাবে জানেন, বুঝেন বা দেখেছেন, তারা উপলব্ধি করতে পারবেন।

গতকাল রাতে ঘুমুতে পারিনি। কাউকে কবরে রেখে এসে ঘুম আসে কি করে? অথচ, বৃহস্পতিবার রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম, শুক্রবারে যতই কাজ থাকুক, আপনাকে দেখতে যাব। আপনার না বলা কিছু সেই গুরুত্বপুর্ণ কথাগুলো শুনে আসব। সকালে উঠে, একজনের ফেসবুক ওয়ালে আপনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চট্টগাম নিয়ে যাওয়ার খবর দেখে আমি থ হয়ে গেলাম। আজকেও কি যাওয়া বা দেখা হবে না। হলো না তো, চট্টগ্রাম গেলেন প্রাণভরা নিঃশ্বাস নিয়ে, ফিরে এলেন নিথর দেহ নিয়ে। শুক্রবার জুমার নামাজেও আপনাকে নিয়ে দোয়া হয়েছে, মোনাজাত হয়েছে। এ দোয়ায় কাজ হলো না। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে তুলেই নিলেন নিজের কাছে। নামাজের ঠিক আগে মোস্তফা ভাইয়ের ছোট ভাই মুন্নাকে বলেছিলাম, মোস্তফা ভাইকে কষ্ট দিস না। তোদের জন্য অনেক করেছে, তোরাও করেছিস। মানুষটা প্রতিদিন মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকে। যতটা পারিস, ভাল রাখতে চেস্টা করিস।

শুক্রবার বিকেলে আপনার চলে যাওয়া খবরটা পেয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। আমার স্ত্রী, ভাইরা আমাকে নিয়ে ভয় করছিল। কারণ কি জানেন, ওরা জানেন আপনার-আমার সম্পর্কটা কি ছিল? এটা সত্য যে, আপনি আমাকে ভীষন ভালবাসতেন, অতুলনীয় স্নেহ করতেন। আজকের এই হান্নানের গড়ে উঠা আপনার হাত ধরেই। সবকিছুই হাতে ধরে শিখিয়েছেন। ক্রীড়া, সাংবাদিকতা, সংগঠক..সবকিছুই। কারণে-অকারণে ফোন দিতেন। ফোন দিয়েই বলতেন, কোথায় আছিস..অফিসে আয়। আপনি প্রথমে বসতেন মহিলা ক্রীড়া সংস্থার একটি কক্ষে। যেখানে আমার সবকিছুর শুরু। পরে এলেন আপনার প্রিয় স্থান শিশু নিকেতনে। পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত আপনি শিশু নিকেতনের অধ্যক্ষের কক্ষেই কাটিয়ে দিলেন। বলতে পারেন, ঐ কক্ষে কি আমার আর যাওয়া হবে? জানি না, হয়তো আর কখনও যাওয়া হবে না। হয়তো বা হবে। স্মৃতি আওড়াতে একপলক দেখে নেয়ার লোভ জাগবে হয়তো। আপনি জানেন? শনিবার দুপুরে যখন আপনাকে শিশু নিকেতনে নিয়ে আসা হল তখন আপনার প্রাণ প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও নাদুস-নুদুস শিক্ষার্থীরা কতটা কেঁদেছে, কতটা ভেঙ্গেছে ভেতরে ভেতরে? আপনি জানেন না, শুধু নিথর পরে ছিলেন খাটিয়ার মধ্যে। দায়িত্বে থাকা কোন শিক্ষককে শেষ বিদায় দেয়া আমার জীবনে এ প্রথম দেখলাম। এ দৃশ্য কতটা বেদনাদায়ক, বুঝাতে পারব না। জানি এ স্কুলে আপনার আর ফেরা হবে না। শুধুই কি স্কুল, উন্নয়ন বোর্ড, ডিসি অফিস, জেলা ক্রীড়া সংস্থা, স্কাউট ভবন, রিজার্ভ বাজার জামে মসজিদ কোথাও তো আপনি আর যেতে পারবেন না। শুধু সর্বত্রই সকলের অগোচরে বিচরণ করবেন, যতটা ভালবেসে গিয়েছিলেন।

আপনাকে ছাড়া এবারের বিজয় দিবস পালন করা হচ্ছে। ভাবা যায়? এই দিনটিতে আপনার সক্রিয়-সরব উপস্থিতি সকলেই মনে রাখে। একেবারে শহীদ মিনার থেকে শুরু করে মারী স্টেডিয়াম পর্যন্ত। আপনার অতি পছন্দের স্কুলটির শহীদ মিনারে ফুল দেয়া ও মারী স্টেডিয়ামের ডিসপ্লেতে এবার আপনি নেই। গতবছরও ছিলেন। এটাই নিয়তি, নিয়মও। প্রতিটি জায়গায় আপনাকে মিস করছি। আপনি আমার লেখাগুলোর প্রুফ দেখে দিতেন, ভুল হলে ঠিক করে দিতেন। অফিসিয়াল চিঠি, রেজুলেশন সবকিছুই তো আপনার হাতে শিখতে শিখতে শেখা। হাতে ধরে শিখিয়েছেন, বকা দিয়েছেন, শাষন করেছেন, ভালোও বেসেছেন। চাট্টিখানি কথা? আপনার উপর আস্থা রাখতে পারতাম। আপনার কাছ থেকে, সিদ্ধান্ত বলেন-সহযোগিতা বলেন সবকিছু দ্রুতই পেতাম। কৌশলে উদ্ধারও করেছেন অনেকের চক্ষশুল ষড়যন্ত্র থেকে। আগলে রেখেছেন নিজের ছোট ভাইয়ের মত সবধরণের বিপদ আপদ থেকে। তাই আমি কি হারালাম, আমি জানি।

কয়েকমাস আগে সবশেষ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিস কক্ষে ডিএসএ,র নির্বাচন নিয়ে আলাপ হয়েছিল। আপনার কন্ডিশন ভাল না দেখে অনুরোধ করেছিলাম, নির্বাচনে না যেতে। আপনি বলেছিলেন, ২০২২ পর্যন্ত মনে হয় না ঠিকে থাকতে পারব। ডিএসএ আমার আত্মার সাথে জুড়ে আছে, শেষবারের মত করি। আমি আর না বলিনি, চেয়েছিলাম সংরক্ষিত আসনে ভোট না হোক, মনোনীত হোক। কিন্তু, আপনাকে লড়তে হল। জীবন যুদ্ধের লড়াই সংগ্রাম করে ঠিকে থাকা আপনাকে হারাতে পারেনি কেউই। ক্রীড়াঙ্গনে শেষবার সে সম্মানটুকুই জিতে নিলেন।

না বলা অনেক কথাই আছে। অনেকের না জানাই ভাল। সময়ের পরতে পরতে আপনি আমাকে এ শহরের অসঙ্গতির অনেক কিছুই বলেছেন। আপনার নিষেধ ছিল। কথা দিলাম, এসব কথা কেউই জানবে না। আরো কিছু বলতে চেয়েছেন। ১ম বিভাগ ফুটবল লীগের কোন এক ম্যাচে দেখা হতেই বলেছিলেন, সময় করে আসিস..কিছু গুরুত্বপুর্ণ কথা আছে। এরপর, ফোনও দিয়েছিলেন। আমার আর যাওয়া হল না। অবশেষে গেলাম, পেলাম আপনাকে, তবে নিথর নিস্তব্ধ একটি দেহ। আপনার বলতে চাওয়া কথা আর শোনা হল না। সারাজীবন এ অপরাধবোধ আমাকে ভুগাবে। তবুও আপনার কাছে ক্ষমা চাই, পারেন তো ক্ষমা করে দিবেন। ভাল মানুষরা আল্লাহর কাছে ভাল থাকে, শান্তিতে থাকে। আপনি আল্লাহর কাছে অনেক ভাল থাকবেন। আমিন।