অসময়ে আত্মসমর্পন !

393
Advertisement

॥ দীপ্ত হান্নান ॥ ভাবতাম, একদিন তোকে নিয়ে লিখব, ক্রীড়াঙ্গনে তোর উত্থান, এগিয়ে চলা এসব নিয়ে। কিন্তু ভাবতেই পারছি না, তোর অবেলায় এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া নিয়ে লিখতে হবে। এত অল্প বয়সে, এভাবে মানুষ চলে যেতে পারে? মাথা কাজ করছে না, সত্যিই কাজ করছে না। এমন কি বয়েস হয়েছে তোর, যে চলেই যেতে হলো!

দুপুরের ভাতটা খেয়ে শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিতেই ফোন এল ছোট ভাই আমিনুলের (আম্পায়ার), ভাইয়া, হামিদ আর নেই!! এমন শান্ত দুপুরেই কি মন ভাঙ্গানোর এ খবরটা শোনাতে পেল আমিনুল। জানতাম তুই অসুস্থ, মাত্র কয়েকদিন আগে তোর বাসায় গিয়ে আমরা (সায়েম ভাই, নতুন দা, বেনু, সুমন) ভালমন্দ দেখে আসলাম। সন্ধ্যে নাগাদ তুই তখন সামনের ঘরটার বিছানায় শুয়ে টিভিতে খেলা দেখছিস। সেদিনও তো তুই বলেছিস, ভাল আছিস, নিয়মিত ডাক্তারের চেকআপ চলছে। ভারতের ডাক্তারের তিনমাসের কোর্স শেষে আবার ভারতে যাবি, এমনটাই বলেছিলি? কিন্তু একি শুনলাম, নিজেকে বিশ^াস করাতে কষ্ট হচ্ছিল। তাহলে কি, ডাক্তারের বেঁধে দেয়া তিনমাসের সময়টা কি তোর শেষ তিনমাস ছিল? হয়তো তুই বুঝিস নি!! নাকি তুকে বুঝতে দেয়নি? সত্যিই মাথা কাজ করছে না। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ তুকে দেখাই কি করে? কতটা ঝরছে?

তোর নাদুস-নুদুস চেহারা আর সুঠাম দেহটায় কখনও মনে হতো না অসুস্থতা তোকে মাত্র তিনটা মাস সময় দিবে এ পৃথিবীতে। সত্যিই মনে হতো না। এ শহরে যে কজন ভাল ক্রিকেট খেলোয়াড় আমার মনোযোগ কেড়ে নিত, তুই তাদের মধ্যে একজন। তোর প্রাণচঞ্চলতা এবং ভ্রমন পিপাসু মন আমার মন কাড়তো। মাঠে আম্পায়ারিং করতে গিয়ে যখন জানতাম, দুই টিমের একটিতে হামিদ আছে, খুব ভাল লাগত। তোর কাভার ড্রাইভ ছাড়াও মিড অফ আর মিড অনের উপর দিয়ে বাউন্ডারী হাঁকানো সত্যিই খুব দেখার মত। ব্যাটিং-এ তোর দ্বায়িত্বশীলতা দেখতাম। ম্যাচের প্রয়োজনে তোর সিঙ্গেল নিয়ে খেলা সত্যিই অসাধারণ। আমি যখন আম্পায়ার থাকতাম, তুই যখন ব্যাটিং করতি, একটা ভয় তোর মধ্যে কাজ করতো তখন। তাহল, এলডিডব্লিউ,র ভয়। ক্রসব্যাট খেললেই এলডিডব্লিউ,র ফাঁদে পরতিস। আমি না দিয়ে পারতাম না। মাঝেমধ্যে একেবারে কাছে এসে বলতিস, ভাইয়া একটু দেখিয়েন। আমি হেসে বলতাম, ক্রসব্যাট না খেললেই তো পারিস। ভাবতে খুবই কষ্ট লাগছে, সেই তুই আর কোনদিনও স্টেডিয়ামে পা রাখবি না, ব্যাট হাতে নেমে আর কখনও রানের ফুলঝুঁড়ি ছড়াবি না। ভাবা যায়?

আমরা যখন কোন জায়গায় বসার সুযোগ পেতাম, রাঙ্গামাটির ক্রিকেট নিয়ে ভাবতাম। কিভাবে এখানকার ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। তুই সবসময় বলতিস, কিছু একটা করেন ভাই? তোর মধ্যে একটা আকুতি দেখতাম। এখানে সবাই ক্রিকেট খেলতো কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে ভাবতো কম, তুই ভাবতিস। কারণে-অকারণে ফোন দিতিস, জানতে চাইতিস, ক্রিকেটের কোন খবর আছে কি না? আরো কত কথা, কক্সবাজার, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ফেনী, চাঁদপুর, বান্দরবান ক্রিকেট ট্যুরগুলোর কথা শেষ করা যাবে না। সব রয়ে গেল, কিন্তু তুই নাই হয়ে গেলি..ভীষনভাবে ভেঙ্গে পড়েছি, তোর চলে যাওয়াতে….

এর মাঝে শুনলাম তোর প্রিয় ক্লাব প্রতিভা ক্রিকেট ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিস। ভীষন খুশি হয়েছিলাম, খেলোয়াড় থেকে ক্রীড়া সংগঠক, ভালোই তো। এভাবেই তো ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ তৈরি হয়, গড়ে উঠে। খেলাধুলার প্রতি তোর অন্তঃপ্রাণে, আমি ভীষনভাবে ভালবাসতাম। আমরা হয়তো এমনই, আমাদের রক্তে মিশে আছে খেলাধুলা। কিন্তু দায়িত্বটা নিতে না নিতেই চলে যেতে হল তুকে। এভাবেই যেতে হয়? কত স্বপ্নই বা পুরণ হয়েছে তোর? পরিবারের দায়িত্বটাও কতটুকু সামলাতে পেরেছিস, বল? বড্ড অবেলায় চলে গেলি….

কোন কিছুই ভাবতে পারি না, বুঝলি। মাত্র ত্রিশে পা রাখতেই একেবারে অসময়ে এভাবে মানুষ যায়? তাও একেবারে? তুই কি জানতিস না এ রোগটার কথা নাকি রোগটাই তোকে জানতে দেয়নি, কোনটা? এভাবে তোরা চলে গেলে, আমাদের আশপাশ তো শুন্য হয়ে যাবে। মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে আমার মা, মোস্তফা ভাই (সাংবাদিক), তুই চলে গেলি!! তোদের ছাড়া আমরা কিভাবে থাকব বলতে পারিস! কিছুই করার নেই, যিনি নিয়ে যাবেন তার পথ আটকায় কার সাধ্যি। তবুও বলতে হয়, প্রিয় হামিদ বড় অবেলায় তোকে যেতে হল, বড় বেশি অসময়ে। এটা অসময়ে আত্মসমর্পন ছাড়া আর কি? ভাল থাকিস আল্লাহর কাছে, এই প্রার্থনা সবসময়।